Feb 15, 2012

ওদেরো পরাণো যাহা চায়..

0 comments



শীত এখন যাই যাই । বসন্তে এখন খুশির ভালোবাসাবাসির হাওয়া । সরস্বতী পুজোতেই সেই হাওয়া ব‌ইতে শুরু করে দিয়েছে । আশি নব্বুইয়ের দশকের হাওয়া ছিল একরকম । আর এখনকার হাওয়ায় অন্য মাদকতা । অর্কুট চৌকাঠ ডিঙিয়ে, ফেসবুকের উঠোন পেরিয়ে, ট্যুইটারের খুপরিতে সেই হাওয়া একটু অন্য স্বাদের । ছেলেমেয়েগুলোর ভাল্লাগেনা একটুতেই । বসন্তের হাওয়া মাখতেও ভাল্লাগেনা ওদের । সব সময়েই যেন ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে ।গায়ে হাওয়া মাখবে কি ! এক তো সরস্বতীর পেন্নামের নেমকম্ম সমাধা করেই লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে সঁপেছে মন । লক্ষ্য শুধুই কেরিয়ার । আর ডাইভারশান বলতে স্টেট্যাস আপডেট । খুব ডিজিটালি একটিভ হলে ব্লগে উগরে দাও মনের ব্যথা । ওদের ব‌ইপড়ার সময় নেই । ওরা ব‌ইমেলা যায় বিরিয়ানি খেতে আর শীতের মিঠে রোদে পিঠে পিঠ দিয়ে বসতে । ওদের বেগুণভাজায় আপত্তি । কি না ডিপ ফ্রায়েড । কিন্তু ফ্রেঞ্চফ্রাইতে ফ্যাশন ইন । ওদের পিত্জায় নাড়িকাটা কিন্তু লুচি? নৈব নৈব চ । ওরা ভালবাসে ভ্যালেন্টাইনসডের স্বীকার হয়ে কিউপিডের পায়ে অর্ঘ্য নিবেদন করতে । তার জন্য যা করতে হয় তাতে রাজী । কি আর করে ! আগে প্রেম একবার কি বড়জোর দুবার আসত নীরবে । এখন আসে বারবার এবং সরবে । আর শপিংমলের মার্কেটিং কি বিফলে যাবে? বিশাল বিশাল রক্তাক্ত হৃদয়নন্দন বনে নিভৃত এ নিকেতনে একাখানি ন্যানো হৃদয় যদি নাই বা দিতে পারে তাহলে কি আর র‌ইল ! সে হীরে হোক বা সেমিপ্রেসাস । নিদেন এক গেলাস সুশীতল গোলাপী পানীয়ের মাঝে ভাসমান একটুকরো বাসি ষ্ট্রবেরী । কিম্বা একপাউন্ড হার্টশেপের চকোলেট কেকের মাঝখানে প্রকান্ড এক চেরী ! তাও স‌ই । সেই কবেই বাংলাব্যান্ডের গানে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শিখে রেখেছে " ভালোবাসা মানে আর্চিস গ্যালারি " ! ক্ষতি কি ! ভালোই বলেছিল তারা । কিন্তু ওরা তো গাছেরো খেল তলারো কুড়লো ।

মধ্যিখান থেকে একবার গাছের পাতা ঝরল মানেই দেশের জিডিপি হৈ হৈ করে বাড়ল কিছুটা । ইন্ডিয়া শাইনিং মশাই । রোজ ডে তে গোলাপ বিকল আগুণ দামে । প্রোপোজ ডে তো গ্রীটিং কার্ডস। কিসিং ডে তে চকোলেট । হাগ ডে তে ডিওডোরেন্ট । আরো কত কি ! যত্তসব ! দিন থাকলেই প্রেম, না থাকলে ঘোড়ার ডেম ! আর সন্ত ভ্যালেন্টাইন ওপর থেকে বলেন " কেমন দিন দিয়েছি বল্‌ "
মক্‌টেল থেকে চকোলেট, কফি থেকে কেক, সোনা থেকে জাঙ্ক সর্বত্র এক কথা " হিয়ার মাঝে লুকোনো একটাই কথা " ভালোবাসি, ভালোবাসি, এই শপিং মলে, মেট্রোরেলে, সুইমিংপুলে, তন্ত্রেমন্ত্রে ভালোবাসি ! সেই কবে কবি বলেছিলেন ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত ! তারা পলাশ চিনুক না চিনুক আজ কিন্তু ভালোবাসার দিন আগতপ্রায় । ভালোবাসায় মধু উবে যাওয়ার আগেই না ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট করতে হবে মন্দারমণির বালুকাবেলায় লিখিনু সে লিপিখানি প্রিয়তমারে ।

পাড়ার গোপালবাবু বলছিলেন অশোকবাবুকে "মশাই নাতনিটা বিয়ে করতেই চায়না, বলালম, ঢের হয়েছে পড়াশুনো , অনেক রোজগার পাতি হল, অনেক ভালোবাসাবাসি তো হল, এবার আগে বিয়েটা সেরে ফেল" তা বলে কি জানেন ? " নিজের আখের আগে গুছোতে দাও, বাজারে নিজেকে আগে দাঁড় করাই তারপর বিয়ে । তার আগে বাজিয়ে, নাচিয়ে, কুঁদিয়ে বেড়িয়েচেড়িয়ে, খসিয়ে নাকি পরখ করে নিতে হবে মনের মানুষটিকে"
অশোকবাবু প্রত্ত্যুত্তরে বললেন "কি আর করবে গোপাল, ওকে ওর মত থাকতে দাও; যুগটাই এমন, এ কি ডি এল রায়ের যুগ যে এমনি এসে ভেসে যাবে? আলোর মতন, হাসির মতন, হাওয়ার মতন? এ তো নেশার যুগ এয়েচে । তোমার নাতনি ডিজিটাল ঢেউ আলবাত পেরুবে । গ্লোবালাইজেশানের ঢেউ এয়েচে না দেশে" !


Feb 12, 2012

ভীমবেটকা

0 comments

কেমন স্থান এই ভীমবেটকা? কোথায় এই গুহা এবং তার গুহাচিত্র?  ভীমবেটকা  যেতে হলে কিভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কখন যাবেন সেই নিয়ে বিশদ আলোচনা  পড়ুন আনন্দবাজার পত্রিকার আর্কাইভে 
( " একটি প্রাগৈতিহাসিক চিঠি", প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকা শনিবার,৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১২) 

Jan 31, 2012

মেলা ব‌ই

0 comments

 শেষ ৮০র দশকে আমার যখন কলেজ বেলা তখন ব‌ইমেলা বাধ্যতামূলক ছিল । কারণ সব অনার্সের ব‌ই লাইব্রেরীতে পাওয়া যেতনা আর কিছু দুস্প্রাপ্য বিদেশী লেখকের টেক্সট ব‌ই সস্তায় পাব সেই আশায়, আর সাথে বন্ধুবান্ধবের জন্মদিনের উপহারে দিতে হবে সারাবছর ধরে , ছোট ভাইয়ের জন্য ছবির ব‌ই, মায়ের জন্য অমনিবাস । চলে আসছি, আবার মনে পড়ে গেল ঠাকুমার জন্য কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতের জন্য বাবা খোঁজ নিতে বলেছিলেন ।  আবার বেরিয়ে আসব তখন মনে পড়ল দিদিমা বলেছিলেন কার যেন লেখা শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত পুঁথি শতছিন্ন হলেও যেন নিয়ে আসি কিনে । ব‌ই কেনা, নাড়াচাড়া, সব করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খাওয়া দাওয়া সেরে ধূলো খেতে খেতে বাসে গিয়ে ওঠা ।
বিয়ের পর ব‌ইমেলা গিয়ে খোঁজ হল মাটিতে বসা তরুণ আর্টিস্টদের কাছ থেকে অরিজিনাল পেন্টিং কেনা আর কালীঘাট পটচিত্র, যামিনী রায় , নন্দলাল বসু, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামী ছবির পোষ্টার সংগ্রহ করা । ঘর সাজাতে হবে । নতুন ঘরবাঁধার জন্য  ব‌ইমেলা  । আরো কিছু টেরাকোটা শিল্পীর কাছ থেকে গিফট আইটেম কেনা  ( তখন অন্যসময় এত সব টেরাকোটা পাওয়া যেত না )  ।
৯০ শুরুতে পুত্রকে নিয়ে হাতে ব‌ই তুলে দিতে হবে । ব‌ইপড়ার অভ্যাস করাতেই হবে । কিন্তু তা তো ইংরেজী ব‌ই । বাংলা উপেন্দ্র কিশোর, সুকুমার রায়, শরদিন্দু তো আমি পড়ে বাড়িতে তাকে শোনাই । তার এক একবার এক একটা সিরিজ চাই । কোনো বার ফেমাস ফাইভ, কোনো বার সিকরেট সেভেন্, কোনো বার নডি ...তারপর এল পুরো টিনটিন, এস্ট্রিকস...  
ততদিনে বাড়ি সিলিকন-চিপময়তায় আচ্ছন্ন ।  কিন্তু ছেলে নাছোড়বান্দা । তার একহাতে চাই ব‌ই অন্যহাতে চাই গেমসিডি ।   সিডিও জায়গা করে নিল কোলকাতা ব‌ইমেলায় ।  মিলতে লাগল ফেলুদা, টেনিদা, ঘনাদার অনুবাদও ।   এ প্রজন্ম বাংলা পড়বেনা  । কিন্তু আমার ছেলের কৈশোর যে অধরা থেকে যাবে তাই অনুবাদই স‌ই ।  তখনো কোলকাতার ক্ষুধার রাজ্য সুপ্ত শিল্পীসত্তায় জেগে রয়েছে । কিন্তু ডিজিটালি । অর্কুটময় গদ্যে, ফেসবুকময় কবিতায়, ট্যুইটারময় সনেটে । যন্ত্রজালে জায়গা করে নিয়েছে কত কত উদ্বাস্তু ব্লগবসতি । দুইবাংলার পাবলিক এখন পড়ে কম, লেখে বেশী ।
এখন ব‌ইকেনার চেয়ে স্বরচিত ব‌ইপ্রকাশের পাবলিসিটিতে আত্মহারা তারা । ব‌ইমেলায় হারিয়ে যাচ্ছে শরদিন্দু, সুনীল শক্তিরা । নবপ্রজন্মের কাছে হ্যারিপটার বেশী পাত্তা পায় । ঠাকুমার ঝুলিতে ধূলোর আস্তরণ ।   আর ব‌ইয়ের পাশাপাশি অ-ব‌ইয়ের স্টলও নেহাত কম নয় ।  যে যার ঢাক পেটাচ্ছে জোরেজোরে । জিটকের চ্যাটবাক্সের হাতছানিকে  উপেক্ষা করে কে যায় আর ব‌ইমেলায় ? ব‌ইপ্রেমীর পৃথীবি ফেসবুকময় । যারা যাচ্ছে তারা খাচ্ছে কিন্তু গিলছেনা । যারা পাচ্ছে তারা হেলায় হারাচ্ছে নীহাররঞ্জন-বিভূতিভূষণদের  । আর কিছু খাচ্ছে প্রচন্ড ক্ষুধাতাড়নায় । কেউ কিনছে নতুন ব‌ইয়ের আলমারীতে অমুক সমগ্র, তমুক অমনিবাস সাজিয়ে রাখার জন্য । আর স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের গুগলময় রাজ্যে ব‌ইমেলা নেহাতই একটা মিটিং গ্রাউন্ড । শীতে প্রেমঝারি জমে ক্ষীর  ।
থরে থরে পসরা । বাঙালীর রসনা তৃপ্তির একমেবমদ্বিতীয়ম খোরাক ব‌ই । কিন্তু ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতা বেশী । ঠিক যেমন গানের সিডি বাজারে থরে থরে সাজানো কিন্তু শ্রোতার চেয়ে শিল্পী বেশি ।  
লে ছক্কা !   হাতের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র কপি-পেস্ট । বেকার পয়সা নষ্ট করা কেন !     দাদু ঠাকুমার আয়ু বেড়েছে  । দাদু আর রামায়ণ পড়েন না কারণ ডিমেনশিয়া । ঠাকুমার চৈতন্যচরিতামৃত তাকে ধূলো খায় কারণ এলঝাইমারস । বাবার নেটেই সব পড়াশুনো হয়ে যায় কারণ সামনে খোলা ল্যাপটপ  । মায়ের অনলাইন সব খবর মিলে যায় কারণ উপচে পড়া ডিজিটাল বন্ধুমহল । আর ছেলেপুলের ব‌ইমেলা যাওয়া হল নিছক আউটিং কারণ স্টেটাস সিমবল । কিন্তু তবুও সরস্বতীও আসেন এই সময়েই  । তাই ব‌ইমেলাও আসবে তার নির্ঘন্ট মেনে । থিমও থাকবে একটা কিছু । নতুন নতুন ব‌ইতে উপচে পড়বে স্টল ।  কোলকাতা ব‌ইমেলা বেঁচে থাকবে তার ঐতিহ্য আর রাজকীয়তা নিয়ে কারণ তবুও বাঙালীর একটা কিছু বলার মত নেশা হ'ল ব‌ইকেনা । 

Jan 29, 2012

শীতলষষ্ঠী

0 comments

সরস্বতীপুজোর পরদিন গোটাষষ্ঠী বা শীতল ষষ্ঠী। পশ্চিমবঙ্গের রীতি । অনেক পূর্ববঙ্গের মানুষও শখে করেন । আমাদের অরন্ধন আজ । শ্রীপঞ্চমী তিথি থাকতে থাকেতেই গোটা রেঁধে রাখতে হয় । গোটা মুগডাল (সবুজ মুগকলাই ), গোটা শিম, গোটা মটরশুঁটি, গোটা রাঙা আলু, গোটা আলু, গোটা বেগুণ জোড়া সংখ্যায় দিয়ে  (কমপক্ষে ৬টি করে ) গোটা সেদ্ধ হয় নুন দিয়ে । সাথে গোটা শুকনো লঙ্কা আর নুন ।  গোটা মুগ ডালকে শুকনো খোলায় একটু নেড়ে নিতে হবে যতক্ষণ না হালকা গন্ধ বেরোয় । কিন্তু প্রেসারে রাঁধা চলবে না । আর কিছু পরে ঢাকা খুলে দেখতে হবে কিন্তু ডাল বা সবজীকে হাতা দিয়ে ফাটানো চলবেনা ।   সেদ্ধ হয়ে গেলে কাঁচা সরষের তেল দিয়ে নামিয়ে রাখা হয় ।    সাথে পান্তাভাত আর সজনেফুল ছড়ানো কুলের অম্বল ও টক দৈ । সরস্বতীপুজোর পরদিন আমাদের দুপুরের আহারে আর কিছু খাওয়া চলবেনা ।  সবকিছু বাসি রান্না আজ খাওয়ার রীতি । এ হ'ল আমার শ্বশুরবাড়ির রীতি ।
আমার বাবার বাড়িতে খন্ড গোটা । গোটা বিউলির ডাল পালংশাকের গোড়া, মূলো কেটে কেটে আর সাথে আর সব গোটা আনাজ ( শিম, মটরশুঁটি, আলু) দিয়ে   রাঁধা হয় । আমাদের বাড়িতে হয় টাটকা গোটা ।  গোটাসেদ্ধ নামানোর পর কাঁচা সরষের তেল ও আদামৌরী বাটা দেওয়া হয় । কারোর রীতি পঞ্চশস্যের গোটা বানানো ।
 আমাদের আজ শিলনোড়া হলুদ ছোপানো কাপড় পরিয়ে ঠান্ডা হলুদ জলে রাখা থাকে । শিলের কোলে থাকে তার নোড়াটি আর মাথায় জোড়া শিম ও জোড়া কড়াইশুঁটি ।   আজ বহুবছর ধরে বাংলার এই রীতি মেনে আসছেন মায়েরা তাদের সন্তানের মঙ্গলার্থে ।  

Jan 28, 2012

ফর্মূলানন্দ

0 comments

ছোটদের ম্যাগাজিন "ইচ্ছামতী" শীতসংখ্যা ২০১২ তে প্রকাশিত 

ফর্মূলা ওয়ান ফ্লায়ার
২০১১ ভারতের খেলাধূলার জগতে এক নতুন অধ্যায় রচনা করল । তথাকথিত স্পোর্টসের পাশাপাশি এবছর উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ফর্মুলা ওয়ান গাড়ির রেস ।  মনে হয় ভারতের মাটিতে যে স্পোর্টসের সূচনা হল এবার আগামী বছরগুলিতে এর উন্মাদনা অব্যাহত থাকতে বাধ্য । এখন নাকি ফুটবলের মাঠে ভীড় হয়না মোটে, ক্রিকেটের প্রচুর অবিক্রীত টিকিট পড়ে থাকে । কিন্তু ঐ তিনদিন অর্থাত ২৮শে অক্টোবর থেকে ৩০শে অক্টোবর  নয়ডায় জেকে গ্রীণ স্পোর্টস সিটিতে একলাখেরো বেশি উপচে পড়া মানুষের ভীড় দেখে সে কথা মনে হল না। 


"বুক মাই শো" তে অনলাইন টিকিট কাটার পর টানটান উত্তেজনায় ছিলাম ক'টা মাস । অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান হল । সারাদেশ জুড়ে একদিকে জ্বলছে দীপাণ্বিতার আলোকমালা আর নয়ডার 'জেপি গ্রীণ স্পোর্টস সিটি' তে তখন সাজোসাজো রব, ইনঅগুরাল ফর্মুলা ওয়ান গ্রাঁ প্রি' র।  বাতাসে হিমের ছোঁয়া নিয়ে ঊণতিরিশ এবং তিরিশে অক্টোবর হাজির হয়েছিলাম আমরা সেই বুদ্ধ ইন্টারন্যাশানাল সার্কিটে । কিছুদূর গাড়ি করে যাবার পর শাটলবাস আমাদের নিয়ে গেল স্টেডিয়ামে । নিজেদের টিকিট অনুযায়ী নির্ধারিত জায়গায় বসে পড়লাম । প্রথমে ছিল বেশ কিছু প্র্যাকটিস সেশন এবং ফর্মুলা ওয়ান গাড়ি ছাড়া অন্যান্য গাড়ির প্রথাগত রেস। ৩০ তারিখে ফাইনাল রেসের ঠিক আগে হেলিকপ্টার আকাশ থেকে বারবার এসে ট্র্যাক পরিদর্শন এবং ছবি তুলতে লাগল । তারপর শুরু হল একে একে ড্রাইভারস প্যারেড । একটি করে ভিন্টেজ কারে এক একজন ড্রাইভার একে একে হাত নেড়ে রাজকীয় কায়দায়  ট্র্যাক পরিক্রমা করে চলে গেলেন । তারপর সেফটি কার এসে বারে বারে ট্র্যাকের নিরাপত্তা পরিদর্শন করে গেল । তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ।

বুধ ইন্টারন্যাশনাল সার্কিট


অবশেষে 'দিন আগত ঐ, ভারত তবু কই?'  হ্যাঁ, ছিলেন আমাদের শিবরাত্তিরের সলতে নারায়ণ কার্তিকেয়ণ  আর ফোর্স ইন্ডিয়া টিমে ছিলেন চালক সুটিল ।


খেলার মাঠে কারো লক্ষ্য বলের গতিতে কারো কবজির জোর টেনিস র‍্যাকেট এ, কারো আনন্দ পায়ে বল মারাতে  । কেউ চলে জলের স্রোতে সাঁতারাতে , কেউ ঘোড়ায় চড়ে পোলো খেলায়, কেউ দাবার চালে, কেউ ধনুর্বিদ্যায়।   কারো আবার আনন্দ এবং লক্ষ্য দুইই গতিতে এবং গতির আনন্দে ।    এবার আলোচনা করা যাক  ফর্মুলা ওয়ান কি এবং কেন এই সম্বন্ধে ।

 ফ্রান্সের সংস্থা "ফেডারেশান ইন্টারন্যাশানাল ডি লা অটোমোবাইল" (FIA)  এই বিশেষ রেসের জন্য  গাড়িগুলির জন্য যে আকার, আকৃতি এবং গঠনের  ফর্মুলা নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই অনুসারে "ফর্মুলা ওয়ান" গাড়ি তৈরী হয় । এই ফর্মুলাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ
-গাড়ির মাঝখানে ইঞ্জিন থাকতে হবে,
-উন্মুক্ত ককপিট থাকবে,
-একটিমাত্র সিট থাকবে,
-উইং থাকবে সামনে ও পেছনে ,
-গাড়ির চালক সহ গাড়ির ওজন হতে হবে মাত্র ৬৫০কেজি
-গাড়িটি যেন ঘন্টায় শূন্য থেকে ১৬০কিমি যেতে পারে ও  ৫ সেকেন্ডের কম সময় যেন  ঐ স্পীড কমে  আবার যেন নেমে আসতে পারে

ফর্মূলা ওয়ান গাড়ি

এই স্পেসিফিক ফর্মুলায় তৈরী গাড়িকেই বলে ফর্মুলা ওয়ান গাড়ি । GP Motor Sports অর্থাত  Glitz & Glory, Power &  Precision, Man & Machine, Speed & Style এই চারটির সমন্বয়ে তৈরী হয় ফর্মুলা ওয়ান । এখানে গাড়ী এবং তার চালক হল প্রধান । গাড়ী শুধু জোরেই যায় না কিন্তু অসাধারণ কায়দা এবং কৌশলের বৈচিত্র্যে ভরা এই স্পোর্টস ।  বারটি টিমের চব্বিশটি ড্রাইভার সহ চব্বিশটি গাড়ি যেন প্রত্যেকটি এক একটি আইকনিক অবতার। গতিশীলতা যাদের শিরায় শিরায়, হৃত্স্পন্দনে সুস্থিরতা । গাড়ীর ইঞ্জিনের গর্জন যত বেশি গাড়ির চালকদের হৃত্স্পন্দন বা পাল্স রেট ততই ক্ষীণ ।  গাড়ির গতির ওঠানামায় ড্রাইভারদের উত্তেজনার পারদকে কঠিন নিয়ন্ত্রণে রেখে  অসাধারণ নৈপুণ্যে বিদ্যুত্গতির গাড়িগুলিকে অত্যন্ত জটিল পথ এবং পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে প্রতিঘন্টায়  সর্বোচ্চ  ৩০০ কিমি বেগে সবশুদ্ধ ৩০০কিমি পথ অতিক্রম করতে হয় । গাড়ি যে থামে না এমন নয় । এক অবিশ্বাস্য আট সেকেন্ডের মধ্যে গাড়িকে থামিয়ে চারটি চাকা বদল করে এবং ট্যাঙ্কে জ্বালানী ভরে নিয়ে ধনুক থেকে তীরের মত ছিটকে বেরিয়ে পড়ে সেই গাড়ি আবার ট্র্যাকে গতিপ্রাপ্ত হয়ে । এ ওকে অতিক্রম করতে গিয়ে ঠোকাঠুকি লাগে এবং অনেক সময় গাড়ি ট্র্যাক থেকে বেরিয়ে যায়  । দুর্ভাগ্যবশত কখনো কখনো দুর্ঘটনার মুখে পড়ে গাড়ি ও তার চালক । হতাহত হয় চালক । দর্শক আহত হবার নজির ও আছে এই রেসে যখন গাড়ি লাফিয়ে এসে দর্শকাসনে পড়েছে । তাই বিশাল ফেন্সিংয়ের ব্যব্স্থা থাকে এখন । কিন্তু এ  সবকে তুচ্ছজ্ঞান করে ড্রাইভার্, মেকানিক  ও দর্শকরা এই অসাধারণ উন্মাদনায় মেতে ওঠেন কারণ ফর্মুলা ওয়ান একটি ক্রীড়া নয় এটি একটি জীবনধারার প্রতীক । যারা এই উন্মাদনায় মাতেন তারা অনেকেই ভাবেন যে তাদের ধমনীতে রক্ত নয় যেন পেট্রোলের তরঙ্গ বয়ে চলেছে এবং হৃত্পিণ্ডের বদলে ৬ সিলিন্ডার ও ৩ লিটারের  V-6ইঞ্জিন তাদের বুকের মধ্যে তোলপাড় করছে ।  আর চব্বিশটি গাড়ি যেন উচ্চৈঃস্বরে ছুটতে ছুটতে গিয়ে বলে আমাকে বাঁচতে দাও; তারস্বরে গগনভেদী চিত্কারে বলে ওঠে আমাকে আগে যেতে হবে, আমাকে শিখরে পৌঁছতে হবে কিম্বা হাম হোঙ্গে কামৈয়াব ।
 ভারতের দল


গতির ছন্দে মেতে উঠে গতির দুনিয়ায় পা রেখেছেন ভারতের নারায়ণ কার্তিকেয়ণ; ফর্মুলা ওয়ান রেস করেছেন ভারতের বাইরে । ভারতীয় মালিকানায় ফর্মুলা ওয়ান টিম ফোর্স ওয়ান আগে ছিল বিজয় মাল্যর । অধুনা সেটি যৌথ ভাবে বিজয় মাল্য এবং সাহারার  মালিকানায় । কিন্তু ভারতের মাটিতে ফর্মুলা ওয়ান টিম পা রাখল এই বছর অর্থাত ২০১১ র অক্টোবরে । ২০১১ সালের ১৭তম রেসটি হল ভারতের মাটিতে, উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডায়।  নয়ডার বুদ্ধ ইন্টার ন্যাশানাল সার্কিটে ২৮, ২৯ ও ৩০ শে অক্টোবর ফর্মুলা ওয়ান রেস হল ।    এবছর এই টিমে সবশুদ্ধ বারোটি দলের চব্বিশটি গাড়ির চব্বিশজন ড্রাইভার যথার্থই কাঁপিয়েছেন ভারতবর্ষের মাটি ।  প্রত্যেক টিমে দু'জন ড্রাইভার থাকেন ।

এবার ছিলেন

  •     রেডবুল টিমের সেবেষ্টিয়ান ভেটেল এবং ওয়েভার,
  •     ভোডাফোন ম্যাকল্যারেন মার্সিডিজের হ্যামিল্টন ও জেনসন বাটন্,
  •     মার্সিডিজ জিপির মাইকেল স্যুমাকার ও নিকো রসবার্গ,
  •     স্কুডেরিয়া ফেরারির ফেলিপ মাসা ও ফার্ণান্ডো এলোনসো
  •     ফোরস ইন্ডিয়ার পল ডিরেষ্টা ও এড্রিয়ান সুটিল,
  •     রেনোর  নিক হাইডফেল্ড ও ভিটালি পেট্রোভ, 
  •     লোটাস রেনোর হাইকি কোভালাইনন ও ইয়ারনো ট্রুলি
  •     উইলিয়াম কসওয়ার্থ টিমের রুবেন্স ব্যারিচেলো ও প্যাষ্টার মালডোনাডো
  •     এইচ আরটি কসওয়ার্থ টিমের নারায়ণ কার্তিকেয়ণ ও ভিট্যান্টোনিও ল্যুইজি
  •     ভার্জিন কসওয়ার্থ এর টিমো গ্লক ও জেরোম ডি এমব্রোজিও ,
  •     সবার ফেরারি টিমের কামুই কোবায়াশি ও সার্জিও পেরেজ এবং
  •     দ্বাদশ ও শেষ টিম টোরো রোসো ফেরারির  সেব্যাস্টিয়ান বুয়েমি ও জেইম এলগ্যুয়ার সুয়ারি ।


পৃথিবীতে ১৯৫০ থেকে ফর্মালি সব নিয়ম কানন মেনে আনুষ্ঠানিক ভাবে ফর্মুলা ওয়ান রেস হচ্ছে । সবচেয়ে গ্ল্যামারাস ও সফিষ্টিকেটেড স্পোর্টস হল ফর্মুলা ওয়ান । ব্যয়সাপেক্ষও বটে। উন্নতমানের প্রযুক্তি এবংবিশেষ কৌশলে তৈরী হয়   এই ফর্মুলা ওয়ান গাড়িগুলি । বর্তমান যুগের গাড়িগুলি ৮সিলিন্ডারের ইঞ্জিন এবং ৩০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ।  সবমিলিয়ে টিম ফর্মুলাওয়ানের কোঅর্ডিনেশন দেখবার মত । গাড়ির সাথে ড্রাইভারের ,  তার সাথে পিটক্রুদের সহযোগিতা, সেফটি কারের পথ প্রদর্শন  বা ইয়ালো ফ্ল্যাগ দেখেই গাড়ি থামিয়ে রেস বন্ধ করে দেওয়া এও দেখার । এই ফর্ম্যুলা কারের চাকা এবং ইঞ্জিনই হল  গাড়ির আসল জিনিস । চাকার লজিষ্টিকস এর অবদান এই রেসে অন্যতম । ভিজে মাটির জন্য একরকম চাকা এবং শুকনো মাটির জন্য আরেকরকম চাকা বরাদ্দ থাকে । আবার কোন চাকা কতক্ষণ রেস করার পর কত দ্রুত  তাকে বদলাতে হবে তাও ভাবতে হয় । আর অবিশ্বাস্য হল গাড়ির চালকরা ।

  •     এদের রক্তচাপ খুব কম হয় ।
  •     নাড়ির বেগ বা পালস রেট হতে হবে অত্যন্ত কম ।
  •     শরীরের ওজন হতে হবে অনূর্দ্ধ ৭০ কেজি ।
  •     আর চশমা থাকলে নৈব নৈব চ ।
গাড়ি


 দুর্দান্ত রেসিং ট্র্যাকটি তৈরী হয়েছিল । পুরো ট্র্যাকটি হল একটি ল্যাপ যার দৈর্ঘ্য হল ৫.১৪ কিমি । এবার ফাইনাল রেসের দিন অর্থাত ৩০শে অক্টোবর দুঘন্টায় বারোটি টিমের চব্বিশটি গাড়ি ৬০বার ঐ ট্র্যাক প্রদক্ষিণ করল । তার আগে ২৮ ও ২৯ তারিখে প্র্যাকটিস রেস বা কোয়ালিফাইং হল ।

ভীড়


পর পর গগনভেদী চিত্কারে গাড়ীগুলি পিট থেকে বেরিয়ে মেইন ট্র্যাক ধরে চলতে শুরু করল  । এভাবে ৬০ বার পরিক্রমা চলতে লাগল ঘন্টা দুই ধরে । কি চরম উত্তেজনার সামিল আমরা তখন ! কখনো দুটি গাড়ি একে অপরকে ছুঁই ছুঁই, কখনো অবলীলায়  চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই হুস করে সামনে দিয়ে চলে গেল । বুদ্ধ সার্কিটে ফর্মুলার ওয়ানের আসরে আকাশ বাতাস তখন গাড়ির শব্দে মুখর । কানে ইয়ার প্লাগ তবুও কাজ হলনা । পাশের লোকের কথাও শোনা যায় না সেই আওয়াজে । গতির লড়াইয়ে ২৪জন চালক তখন একে অপরকে টেক্কা দিতে ব্যস্ত । আমরাও গতির রোমাঞ্চে রোমাঞ্চিত । কি হয় কি হয় ! আমাদের ট্র্যাকের সামনে দুবার অঘটন ঘটেছিল যা অবিশ্যি কিছুই নয় । কিন্তু চোখের সামনে দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম আমরা । ফিলিপ মাসা এবং লুইস হ্যামিলটন একে অপরকে ওভারটেক করতে গিয়ে চাকায় চাকায় স্পর্শ করে; স্পিন খেয়ে মাসার গাড়ি ট্র্যাকের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে আবার সে সাবলীল গতিতে   ঢুকে এসেছিল ঠিকমত, যেন কিছুই হয়নি এই ভাবে । দুঘন্টা পর দেখা গেল সেবেস্টিয়ান ভেটেলই এগিয়ে রয়েছে সকলের চেয়ে ।    ৬০ ল্যাপের পর সেবেষ্টিয়ান ভেটেলকেই চাম্পিয়ান ঘোষণা করা হল । সামনে বিশাল টিভির স্ক্রিনে শচীন তেন্ডুলকারের চেকার্ড ফ্ল্যাগ নাড়া দেখে বুঝলাম খেলা শেষ । 

Jan 26, 2012

আমার খেলাধূলো

0 comments
  ছোটবেলা থেকে আমি স্পোর্টস সম্বন্ধে খুব একটা কৌতুহলী ছিলামনা । ক্রিকেট ও ফুটবল উত্তেজনার সামিল হয়ে বাড়িতে বসে টিভির সামনে একরাশ মুখরোচক খাবার নিয়ে গোলে হরিবোল দিয়ে " আউট",  "এলবিডব্লিউ"  কিম্বা "গোল"ও বলে দিতুম  বারবার । তবে কোনো খেলাধূলাতেই বেশী আগ্রহ ছিলনা । একেবারে খবর সম্বন্ধে আপডেটেড না থাকলে স্কুলে বা কলেজে একঘরে হয়ে যাব সেই ভয়ে যতটুকু হওয়া যায় আরকি। শুধু একবার ছেলের পাল্লায় পড়ে কোলকাতায় আই পি এলে নাইট রাইডার্সের খেলা দেখতে গিয়েছিলাম  ইডেনের মাঠে । কিন্তু সেখানে গিয়ে মনে হয়েছিল টিভিতে খেলা আরো বেশি উপভোগ্য । গ্যালারীতে বসে নাতিদীর্ঘ ব্যাটসম্যান ও খুদে খুদে খর্ব বোলার দেখে মন ভরেনি । কলেজে আমাদের যেমন বেশ কিছু ক্রিকেট আইকন ছিল । রবি শাস্ত্রী বা আজহার উদ্দীন বা ওয়াসিম আক্রম, বব উইলিস জ্বরে বান্ধবীরা আক্রান্ত সে যুগে । তাই এদের কেউ কেউ আমারো যে হাটথ্রব ছিলনা সে কথা বললে মিথ্যে বলা হবে ।  কিন্তু আইপিএল দেখতে গিয়ে মনে হল ধুস্‌ ! ক্রিকেটারদের সুঠাম, বলিষ্ঠ চেহারাটাই তো দেখতে পেলামনা ! একে তো খেলার কত বুঝি তার ঠিক নেই !  এতো গেল স্পোর্টস সম্বন্ধে নিরুত্সাহী আমার কথা । এবার যখন চল্লিশ পার হলাম তখন দেখলাম আমি হাঁটা, জগিং বা জিম এ আসক্ত হয়ে পড়ছি । তখন মনে হল আমার ব্যথা যখন আনে আমায় তোমার দ্বারে অর্থাত ক্রীড়ার দ্বারে, আমি আপনি এসে দ্বার খুলে দিয়ে ডাকি তারে ।  এখন ক্রিকেট, ফুটবল দেখলে মনে হয় খেলতে পারলে শরীরটা আরো বুঝি ফিট থাকত । 
ছেলে যখন ছোট তখন তার স্পোর্টসে যারপরনাই আসক্তি যেমন আর পাঁচটা ছেলের হয় । আমার ছেলের আবার তার বাবার মুখে গল্প শুনে শুনে আর নানারকম গাড়ির ব‌ই পড়ে পড়ে গাড়ির রেস, গাড়ির rallyর প্রতি আসক্তি জন্মাল । হেন ব‌ই নেই যে সে তার ছবি দেখেনি আর গাড়ির সম্বন্ধে হেন তথ্য নেই যে সে জানেনা । এখনো আমাদের বাড়িতে কেউ গাড়ি কিনবে বললে তার ভালোমন্দ তাকে জিগেস করা হয় । এরূপ ছেলের মা কেও অনেক কিছু খোঁজ খবরাদি রাখতে হয় গাড়ির সম্বন্ধে । অতিপ্রিয় টিভি সিরিয়ালটি দেখার লোভ সংবরণ করতে হয় তার মাকে যখন অন্য একটি চ্যানেলে অটো রেসিং হয় । নিয়মিত অটোকার এবং মোটরিং ম্যাগাজিন তার হাতে তুলে দিতে হয়  । মোটামুটি আমার বাড়িতে আমার শ্বশুরমশাইও তেমনি ছিলেন । সেই যুগে ব্যারাকপুরে গাড়ির রেস দেখতে নিয়ে যেতেন আমার স্বামীকে । বাড়িতে সব ভিন্টেজ কারের এলবাম ও রাখা আছে । ছেলের বাবাও ডালাসে পড়াকালীন Dallas Grand Prix দেখেছিলেন আর কোলকাতায়  শীতকালে ইষ্টার্ণ কম্যান্ড স্টেডিয়ামে প্রতিবছর  The Statesman আয়োজিত  The Vintage Car Rally র জন্য আমারো উতসাহ কিছু কম ছিলনা ।
এহেন আমি, শ্বশুরবাড়ির পরিমন্ডলে একদা ছিলাম হংস মধ্যে 'বক' যথা ।  কিন্তু সেই বকের দেখলাম এই গাড়ির স্পোর্টস সম্বন্ধে উতসাহ বেড়েই চলেছে । এতদিন টিভিপর্দায় যে গাড়ির রেস আমরা দেখতাম তা হত বিদেশে ।ছেলে বাবাকে জিগেস করলেই তিনি বলতেন " মন দিয়ে পড় এখন্, আমাদের দেশে হলে নিয়ে যাব তোমায়"  তাই গতবছর থেকে যখন দিল্লীতে ফর্মুলা ওয়ান গাড়ির রেস হবে ঘোষিত হল তখন থেকেই মোটামুটি আমরা স্থির করেছিলাম মাঠে যাব । বেশি দামী টিকিট না কিনতে পারি সস্তার টিকিটেই দেখব....(ক্রমশঃ)

Jan 9, 2012

মধ্যপ্রদেশ (১)

0 comments
 
সেদিন ছিল শীতের মধ্যরাত্রি । ১৯শে ডিসেম্বর রাত তিনটেয় কোলকাতা থেকে হাওড়া স্টেশনে গিয়ে ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে ভোর সাড়ে চারটেয় জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম আমরা ছ'জনে । ট্রেন ছাড়ার কথা আগের দিন রাতে ।  কিন্তু সরকারী নিদেশে রাতে কোনো ট্রেন যেতে পারবেনা ঝাড়খন্ডের মধ্য দিয়ে । তাই আমাদের এই হয়রানি ।
ঐ দিন আবার আমার জন্মদিন ছিল । বেশ অন্যরকম জন্মদিন হল এবার । আমি নিজেই কেক বানিয়েছিলাম একটা । আমার শাশুড়িমা কুচো নিমকি আর আমার মা কড়াইশুটির কচুরী বানিয়ে নিয়ে ছিলেন সাথে । আমি একদম শুকনো করে ঝাল ঝাল আলুর দম রান্না করে নিয়েছিলাম । সাথে ছিল নলেনগুড়ের সন্দেশ । ভোর হতেই সকলে হ্যাপি বার্থডের রেকফাস্ট নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়ল । গরম চা কেনা হল আর সাথে সব খাবার দাবার দিয়ে জম্পেশ প্রাতরাশ হল সেই সকালে । খেয়ে দেয়ে আবার চলা কু ঝিক ঝিক করে । সাথে কয়েকটা ম্যাগাজিন । সকলে মিলে হৈ হৈ করে যাবার মজাটাই আলাদা । অবশেষে বার ঘন্টা পর অর্থাত বিকেল সাড়ে চারটের সময় আমরা পৌঁছলাম বিলাসপুর । গাড়ি করে এবার অমরকন্টক যাবার পালা ।    বিন্ধ্য ও সাতপুরা যেখানে মিলিত হয়েছে মৈকাল পর্বতের সাথে সেই স্থানে অমরকন্টক ।  
খুব গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলতে লাগল । প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘন্টা চলার পর ক্লান্ত হয়ে সেই রাতে আমরা অমরকন্টকে এসে পৌঁছলাম । মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের হলিডে হোমে বিলাসবহুল তাঁবুতে রাত্রিবাস । ৬জনের জন্য ৩টি তাঁবু । ঘরে রুম হিটার ছিল তাই রক্ষে । পরদিন ভোরে খবরের কাগজে দেখি সেরাতের তাপমাত্রা ছিল ১ডিগ্রি সেল্সিয়াস । রাতের খাওয়া হলিডেহোমের রেস্টোরেন্টেই সারা হল ।  ভেজ স্যুপ্, স্যালাড, গরম গরম রুটি, ডাল আর পনীর সহযোগে ।  পরদিন ভোরে উঠে জায়গাটির আশপাশ দেখে, চারিদিকে ফুলের সমারোহ আর ঝকঝকে তকতকে একটা নান্দনিক শোভায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম । স্নান, প্রাতরাশ সেরে এবার আমাদের যাত্রা অমরকন্টকের পুরোণো এবং নতুন মন্দিরের উদ্দেশ্যে। সাথে অবশ্যই নর্মদা এবং শোন নদীর উত্স সন্ধান ।   
 MPTDCর হলিডে হোমের তাঁবু     
 কলচুরি মহারাজ কর্ণ তৈরী করেছিলেন এই সব প্রাচীন মন্দির .....

 অমরকন্টকের প্রাচীন মন্দির
 নর্মদা-উদ্‌গম-এই কুন্ডের ১২ফুট নীচে নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গের পাশ দিয়ে নর্মদা উত্পন্ন হয়েছে অমরকন্টক পর্বত থেকে । 
 অমরকন্টকের নতুন মন্দির
 সূর্যকুন্ডকে বেষ্টন করে একরাশ মন্দির তৈরী করেছিলেন সম্ভবত অহল্যাবাঈ ....

মাই কি বাগিয়া -যেখানে কুমারী নর্মদার সখ্যতা হয়েছিল গুল-ই-বকোয়ালি নামে সুন্দরী ক্যাকটাস ফুলের সাথে । খেলে বেড়াতেন তার সাথে । এ ও এক লীলা ! এই ফুল নাকি দুর্দান্ত ভেষজ ।  খুব যাগ্-যজ্ঞ করে মানুষ এখানে । নর্মদা এখানে খুব জাগ্রত 
 শোনমুডা ( শোন নদীর উত্সস্থল )
 শ্রীযন্ত্র মন্দির
 কপিলধারা-যেখানে কপিলমুনি তপস্যা করে সিদ্ধিলাভ করেন 
নর্মদাকে ছুঁয়ে দেখা 

Dec 17, 2011

মা গঙ্গার বডিগার্ড শিব

0 comments
 আনন্দবাজার পত্রিকা ১৭ই ডিসেম্বর ২০১১ ওয়ান স্টপ ট্র্যাভেলগ 

তাকিয়ে দেখি ভাগিরথী আমার চোখের সামনে । গঙ্গোত্রীর মন্দিরের বাজারের মধ্যে দিয়ে, মাগঙ্গাকে পুজো দেবার পসরা নিয়ে অলিগলি দিয়ে চলেছি আর ডানদিকে উঁকি মারছে ভাগিরথী । কি তার কলকলানি ! উত্তরকাশী থেকে ভোর ভোর বেরিয়েছিলাম গঙ্গোত্রীর পথে । উত্তরকাশী থেকে ৯৯কিমি দূরে ৩০৪৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত গঙ্গোত্রী । ভাগিরথীর উত্সমুখ হল গঙ্গোত্রী গ্লেসিয়ার যার টার্মিনাস হল আরো ১৮কিমি দূরে গোমুখে । স্থান মাহাত্ম্য বলে, পুরাকালে রাজা ভগীরথ শিবের তপস্যা করে গঙ্গাকে শিবের জটা থেকে গঙ্গোত্রীতে নামিয়ে আনেন । এই ভাগিরথী দেবপ্রয়াগে অলকানন্দার সাথে মিলিত হয়ে গঙ্গা হয়েছে । ভাগিরথীর তীর ঘেঁষে চলতে লাগলাম অজস্র মন্দিরময় শহরতলীকে ফেলে । ভাটোয়াড়ি এল, সামনে অগণিত ভেড়ার পাল পাহাড় থেকে নেমে আসছে সমতলে । দীপাবলী অবধি তীর্থযাত্রা তারপরদিনই প্রবল তুষারপাতের জন্য রাস্তা বন্ধ । মেষশাবকরা আপাততঃ মাস ছয়েকের জন্য সমতলে ঘরকন্না করতে আসছে । সেই জ্যামে কিছুক্ষণ । প্রথমে নদীর সমতলে কিছুটা, আবার উঁচুতে উঠতে শুরু করল গাড়ি ।বীভত্স সরু পাহাড়ের চড়াই পথ । উল্টোদিক থেকে একটা বাস বা গাড়ি এলে বিপদে। অতি সন্তর্পণে পিছু হটে সামনের গাড়িকে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে আবার চলা । সাথে বুকধড়পড়ানি , এই বুঝি পড়ে যায় গাড়ি ! রাস্তার একপাশে পাথরের দেওয়াল আর অন্যদিকে গভীর খাদ । ততক্ষণে ভাগিরথী এক চিলতে নীল সূতোর মত হয়েছে । আর দুর্গম থেকে দুর্গমতর পাহাড়ী পথ । ১৯৯১ সালে ভূমিকম্পের ফলে উত্তরকাশীর রাস্তাঘাট এখনো ভয়ানক । অজস্র ল্যান্ডস্লাইড । বড় বড় পাথরের চাঙড় এখনো ঝুলে পাহাড়ের গা ঘেঁষে । রাস্তা যেন দাঁত মুখ খিঁচিয়ে রয়েছে ! পরের পিটস্টপ গঙ্গনানী । উত্তরকাশী থেকে গঙ্গনানী ৩৯কিমি দূরে । নীল আকাশের গায়ে বরফের টুপি পরা হিমালয়ের চূড়ো । সামনে ঘন সবুজ পাহাড়, স্তরে স্তরে সাজানো । সম্ভবতঃ ঐ বরফচূড়োই গোমুখ গ্লেসিয়ার । গঙ্গনানীর পথ আরো দুর্গম । ভয়ে রক্ত হিম হয়ে গেল । গঙ্গোত্রী পৌঁছে আবার ফিরতে হবে এই ভয়ঙ্কর পথ দিয়ে ! আরো সরু রাস্তা আর মধ্যে মধ্যে ল্যান্ডস্লাইডের নজির ; ভরাবর্ষায় না জানি কি অবস্থা ছিল এখানকার ! একবার ভাগিরথীকে ওপর থেকে দেখতে পাই তো আবার সে হারিয়ে যায় বহুনীচে । উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে গায়ে গরম জামাকাপড়ের আস্তরণ একেএকে । গঙ্গনানীতে একটি গরমজলের কুন্ড ও পরাশর মুনির মন্দির আছে । পাহাড়ের ধাপে ধাপে ঝর্ণার জল গড়িয়ে পড়ছে অবলীলায় । পাহাড়ী ঝোরায় রাস্তা জলময় । এল লোহারীনাগ জলবিদ্যুত কেন্দ্র । কিছুদূরে পাহাড়ের ওপর শৈল শহর হর্ষিল । এবার আবার দেখা গেল ভাগিরথীকে এক ঝলক । ভাগিরথীর ওপর মানেরী ড্যাম আরো সুন্দর করেছে স্থানটিকে । কিছুটা সমতলের মত আর ধারে ধারে কোনিফেরাস পাইন, ক্যাসুরিনার দল সারে সারে । অনেকটা মনোরম রাস্তা ক্যাসুরিনার ছায়াবীথি ধরে । বেশ উপভোগ্য ড্রাইভ । চওড়া রাস্তা, রোদমাখা আকাশ অথচ আমরা চলেছি ছায়ার হাত ধরে । নীল আকাশ আর সবুজ পাহাড়ে মিলে মিশে একাকার । এল লঙ্কা ভিউ পয়েন্ট । খুব সুন্দর দেখায় এখান থেকে । এবার এক চমত্কার দৃশ্য । দুটি পাহাড়ের মধ্যে তৈরী গর্জ দিয়ে ফেনার মত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে ভাগিরথীর স্রোত । পাহাড়ের সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নামছে অবিরাম । অসাধারণ দৃশ্য! এতক্ষণের পথের দুর্গমতা, ভয় ভুলে ছবি নেওয়া শুরু । এবার এল ভৈরোঘাঁটির প্রাচীন শিবমন্দির সেখানে রয়েছেন আনন্দ ভৈরবনাথ, মাগঙ্গার পাহারায় । লেখা "ওয়েলকাম টু গঙ্গোত্রী" । মহাদেব এখানে মাগঙ্গার সিকিউরিটি গার্ড । ততক্ষণে সেই বরফের চূড়ার বেশ কাছে এসেছি । তাপমাত্রাও কমে গেছে অনেকটা । গঙ্গোত্রীর কাছাকাছি এসে মা গঙ্গাকে দেখবার জন্য আকুলি বিকুলি প্রাণ । সেদিন কালীপুজো আর দীপাবলী । গাড়ি গিয়ে নামিয়ে দিল সমতলে। । যার পাশ দিয়ে উঠে গেছে পাহাড়ের চড়াই পথ গোমুখের দিকে । সুদীর্ঘ ১৮ কিমি ট্রেক করতে হয় । আর নীচে চোখের সামনে তখন গঙ্গোত্রী। ভাগিরথীর হৈ হৈ করে বয়ে চলা । কি প্রচন্ড গর্জন তার । কি অপূর্ব রূপ তার । কত উপন্যাস, মানচিত্র, ভূগোল তখন বর্তমান হয়ে ভাসছে চোখের সামনে । বর্ণণা পড়েছি ভাগিরথীর, ছবি দেখেছি এতদিন অবধি এখন সে আমার সামনে; ভাগিরথীকে রাজা না রাণী কি আখ্যা দেওয়া যায় সে বিচার করার ধৃষ্টতা আমার নেই তবে তার যে রাজকীয়তা আছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না । সেই মূহুর্তে আমি তাকে রাণী ভেবে নিলাম । স্রোতস্বিনী তখন নীল ঘাগরার কুঁচি দুলিয়ে, সাদা ওড়না উড়িয়ে নেচে চলেছে আপন মনে । অবিরত তার কোলের কচিকাঁচা নুড়িপাথরকে চুম্বন করে চলেছে । জল নয়, নদী পান্নার কুচি বয়ে নিয়ে চলেছে । অবিরল কুলকুচি সেই পান্নাপাথরের । তার গর্জন ঢেকে ফেলেছে সবকিছু । তার সামনে রোদ্দুরকে মনে হচ্ছে কম তেজী ! দীপাবলীতেই এবছরের মত তাকে দেখে নিতে হবে । ঐদিন সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে সব মন্দির । সেদিন পাহাড়ের শেষরাত । দীপাবলীর রাত । পরদিন ঘরে ফিরবে সকলে মিলে । কেদারনাথ ফিরে আসবেন উখীমঠে । বদ্রীবিশাল যোশীমঠে । গঙ্গোত্রীর মাগঙ্গার ডুলি-পালকিও পৌঁছে গেল আমাদের সাথে সেই এক‌রাস্তায় । সূর্যের দক্ষিণায়নের সাথে সাথে পাহাড়চূড়োয় বরফ পড়বে। তুষারপাত হবে ওপরে । রাস্তা বন্ধ তাই শীতের ছ'মাস সকলে নীচে এসে ঘর পাতবে । আবার সূর্যের উত্তরায়নের সাথে সাথে এরা ওপরে উঠবে । কালীপুজোর দিন গঙ্গাস্নান । পাথর ভেঙে জলে দাঁড়াতেই মনে হল পা দুটো শিথিল । শূণ্য ডিগ্রীর কম বৈ তো বেশি নয় জলের তাপমাত্রা । কোনোক্রমে তিনডুব দিয়ে সকলে পারমার্থিক আনন্দ লাভ করছে । আবার পাথর নুড়ি, উপল সিঁড়ি ভেঙে জল থেকে উঠে ডাঙায় পা দিয়ে চেঞ্জরুম । তারপর গঙ্গারতি, গঙ্গাপুজো আর পিতৃতর্পণ । দেবী সুরেশ্বরী তখনো নাচের ভঙ্গীমায় । মাথার ওপর দুপুর সূর্য । তার ঝলক ভাগিরথীর বুকে । উত্তরদিকে ঘন সবুজ দুইপাহাড়ের মাঝখানে বরফঢাকা গোমুখ । ভাগিরথীর তরল তরঙ্গ নেমেছে সেখান থেকে ।

(কিভাবে যাবেনঃ হাওড়া থেকে হরিদ্বার ও সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে গুপ্তকাশী । পরদিন গুপ্তকাশী থেকে উত্তরকাশী হয়ে গঙ্গোত্রী । )

Nov 26, 2011

ডুবাইলি রে, ভাসাইলি রে..

0 comments
http://sonartoree.files.wordpress.com/2011/09/pujo02.jpg
"আমার ঘরে বসত করে কয় জনা" এর উত্তরে সারা পৃথিবীর অন্ততপক্ষে এক তৃতীয়াংশ মানুষ সোশ্যাল নেটওয়ার্কের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চিত্কার করে সমস্বরে বলবে " এই তো অর্কুট ক্লাবঘরে শ'তিনেক ছাড়িয়ে ট্যুইটার খুপরিতে শ'পাঁচেক আর কেল্লাফতে ফেসবুক পাড়ায় । হাজার ছাড়িয়ে গেলে তুমি তো সেলেব ! স্মার্টফোনের সাথে সোশ্যালনেটের দোস্তি যত বাড়ছে তার ইউসারদের মধ্যেও বাড়ছে সেই বন্ধুত্বের হাতছানি । আর মানুষের ইঁদুর দৌড়ের গতিবেগ যত বাড়ছে তত বাড়ছে স্ট্রেস এবং স্ট্রেন । ফলে কম সময়ে মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে যাবার এই সুবিধে গুলোও মানুষ কাজে লাগাতে শিখেছে বুদ্ধিমানের মত । তাই দোল-দুর্গোত্সবে গ্রিটিংস থেকে শুরু করে জন্মদিন-বিয়ের তারিখ আর হাতের পাঁচ সুপ্রভাত-শুভরাত্রি তো আছেই । তারপর আমি হংকং থেকে হনললু কিম্বা বন্ধু সিকিম থেকে সিঙ্গাপুর পৌঁছিয়েই বার্তা বিনিময় । আমি আজ চিংড়ি না ইলিশ রাঁধলাম তাও জেনে গেল বন্ধু ছবিসমেত । আমার মায়ের রক্তচাপ ঊর্দ্ধমুখী সেও জানলো সারা পৃথিবী । কেউ বা তার বোনের জন্মদিনের কেক কাটার ছবি কেউ আবার শিকাগো কিম্বা টরোন্টোর এয়ারপোর্টে পা দিয়েই সারা দুনিয়াকে জানিয়ে দিল আমি " হেথায় "; কিন্তু কেউ যদি লেখে " আমার খুব বিপদ, কে আছো কোথায় , ছুটে এসো আমার কাছে " তাহলে সেই অগণিত বন্ধুগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কেউ কি আসবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ?অচেনা, অজানা উড়োমিতে-মিতেনীর দলে কে বন্ধু আর কেই বা অ-বন্ধু বোঝা মুশকিল ।
এখন তো কিটিপার্টি থেকে শুরু করে ঘরোয়া পার্টিতে গৃহবধূদের মুখেও সেই এক কথা । দেখা হলেই " তুই ফেসবুকে আছিস্" কিম্বা " গুগ্‌ল প্লাসে একাউন্ট খুলেছিস? " নয়তো যেন তার সোশ্যাল স্টেটাস রক্ষা করাই দায় । কিন্তু একবার বন্ধু হয়ে যাও । ব্যাস! তারপর আর বন্ধুত্বকে কে পায়! সেই অঞ্জন দত্তর গানের মত " তুমি না থাকলে সকালটা এত মিষ্টি হত না " বলে চালিয়ে যাও স্টেটাস আপডেট । আর যদি তুমি ছন্দের কারসাজি জানো তাহলে তো ফিদা হয়ে যাবে বন্ধুকুল তোমার । দুকুল ছাপিয়ে কাব্য ঝরবে ফেসবুকের আঙিনায় । উপছে পড়বে নাতি-১৪০ সনেট । আর ছন্দ না এলেও,
ক্ষতি কি ! না হয় আজ পড়বে , ফেসবুকে লিটারারি কাব্য !
পড়ল কথা সবার মাঝে, যার কথা তার গায়ে বাজে !
তবু বেঁচে থাক সোশ্যালনেট । একাকীত্বের অবসাদে ভুগছেন এমন অনেক সিনিয়ার সিটিজেনের জন্য, একরাশ মনখারাপের দুপুর নিয়ে অপেক্ষমানা হোমমেকারটির জন্য , প্রোষিতভর্তিকার জন্য আর প্রবাসী ছেলেপুলেদের মা-বাপের জন্য ; ডুবাইলিরে, আমায় ভাসাইলি রে " বলে ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়ুন অর্কুট থেকে ফেসবুকে ও সেখান থেকে গুগ্‌লপ্লাসে । ট্যুইট করুন গোটাকতক। বদল করুন প্রোফাইল ছবি মাঝে মাঝে । জগতের হাটের মাঝে আপনার হাঁড়ি ভাঙুন । দেখবেন আপনি আর একা নন । বন্ধুত্বের পারদ যত চড়বে ওপরে আপনিও তত ভালো থাকবেন । সদা থাকো আনন্দে ! হ্যাপি সোশ্যালনেটওয়ার্কিং !  

Nov 14, 2011

ভাগিরথীর উত্স সন্ধানে

3 comments


উত্তরকাশী থেকে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়লাম গঙ্গোত্রীর পথে ।  ভাগিরথীর তীর ঘেঁষে চলতে লাগলাম অজস্র মন্দিরময় শহরতলীকে ফেলে ।

সামনে এল ভেড়ার পাল । অগণিত মেষ শাবক গড্ডলিকা প্রবাহে পাহাড় থেকে নেমে আসছে সমতলে । কারণ সেইদিনই এই পথ বন্ধ হয়ে যাবে । দীপাবলী অবধি তীর্থ যাত্রা হয় তারপর শুরু হয় প্রবল তুষারপাত ফলে রাস্তা বন্ধ থাকে । যাই হোক সেই মেষ শাবকের দল আপাততঃ মাস ছয়েকের জন্য সমতলে ঘরকন্না করতে আসছে । সেই জ্যামে পড়লাম কিছুক্ষণ ।
প্রথমে নদীর সমতলে কিছুটা চলার পর আবার উঁচুতে উঠতে শুরু করল আমাদের গাড়ি ।বীভত্স সরু পাহাড়ের চড়াই পথ । উল্টোদিক থেকে একটা বাস বা গাড়ি এসে গেলে আমাদের গাড়িকে সামলে নিতে হচ্ছিল বারবার । অতি সন্তর্পণে পিছু হটে সামনের গাড়িকে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে আবার চলা ।  ১৯৯১ সালে ভয়ানক ভূমিকম্পের ফলে উত্তরকাশী জেলার রাস্তাঘাট খুব ভয়ানক হয়ে রয়েছে ।  তবে ভাল গাড়ি ও অভিজ্ঞ চালক থাকলে তেমন কিছু ভয় নেই ।

পথে পড়তে লাগল অজস্র ল্যান্ডস্লাইড । বড় বড় পাথরের চাঙড় এখনো ঝুলে রয়েছে পাহাড়ের গা ঘেঁষে । আর ধ্বসের কারণে রাস্তাগুলির আকৃতি হয়েছে ভয়ানক । যেন দাঁত মুখ খিঁচিয়ে রয়েছে !

নীল আকাশের গায়ে  বরফের টুপি পরা হিমালয়ের চূড়ো । সামনে ঘন সবুজ পাহাড়, স্তরে স্তরে সাজানো । সম্ভবতঃ ঐ বরফচূড়োই গোমুখ গ্লেসিয়ার ।
গঙ্গনানী পড়ল । সেখানে একটি গরম জলের কুন্ড আছে । সালফার হট স্প্রিং আর কি ! জলে পা ডুবিয়ে খানিক বসে তুঙ্গনাথের ক্লান্তি কমল কিছুটা;  ফুটন্ত প্রায় জল । কি অপূর্ব সৃষ্টি । বাইরে কি ঠান্ডা আর জলটা কি ভীষণ গরম । স্থানীয় নাম “গর্মকুন্ড”  ।

এবার আবার দেখা গেল ভাগিরথীকে এক ঝলক । পথে ভাগিরথীর ওপর মানেরী ড্যাম আরো সুন্দর করে তুলেছে স্থানটিকে ।  কিছুটা সমতলের মত আর
কিছুদূরে পাহাড়ের ওপর শৈল শহর হর্ষিল   ( উত্তরকাশী থেকে ৭৩কিমি দূরে) । হর্ষিল বিখ্যাত সুমিষ্ট আপেলের জন্যে ।

এবার এক চমত্কার দৃশ্য চোখে পড়ল ।
দুটি পাহাড়ের মধ্যে তৈরী হয়েছে গর্জ আর সেই গর্জ দিয়ে ফেনার মত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে ভাগিরথীর স্রোত ।

এবার এল ভৈরোঘাঁটি বা প্রাচীন এক শিব মন্দির সেখানে রয়েছেন আনন্দ ভৈরবনাথ,  মা গঙ্গাকে পাহারা দিচ্ছেন । সেখানেই লেখা রয়েছে “ওয়েলকাম টু গঙ্গোত্রী” । মহাদেব এখানে মা গঙ্গার দ্বারী বা সিকিউরিটি গার্ড ।  ততক্ষণে সেই বরফের চূড়ার বেশ কাছে এসে গেছি ।

গঙ্গোত্রীর কাছাকাছি এসে মা গঙ্গাকে দেখবার জন্য আকুলি বিকুলি প্রাণ  আমাদের । সেদিন কালীপুজো আর দীপাবলী ।
উত্তরদিকে ঘন সবুজ দুইপাহাড়ের মাঝখানে বরফঢাকা গোমুখ । ভাগিরথীর নেমেছে সেখান থেকে ।

আমার ভূগোল ব‌ইয়ের খোলাপাতা তখন চোখের সামনে
বরফ গলা জলের তাপমাত্রা শূণ্য ডিগ্রীর কম বৈ তো বেশি নয় । ভাবছি বসে নামব কেমন করে জলে ! জলে পা দিয়ে মনে হল শরীরের নীচের দিকটা অবশ হয়ে গেছে । এদিকে কালীপুজোর দিন এসে তিনবার ডুব না দিলে পুণ্যি হবেনা । খুব দোটানায় মন !

অন্য জন ততক্ষণে জলে নেমেই বলে ভিডিও তোলো, জলের এমন গর্জন আর শুনতে পাবেনা ….

স্নান সেরে মা গঙ্গার  তীরে বসে পুজো আর আরতি সারলাম । তারপর আসল মন্দিরে গিয়ে আবার পুজো । দেওয়ালী বলে খুব সাজিয়েছিল ফুল দিয়ে । তবে সেদিন মন্দির বন্ধ হয়ে যাবে বলে তীর্থযাত্রীর ভীড় নেই বললেই চলে । কিছু লোকাল মানুষজন এসেছিলেন পুজো দিতে আর দু চার জন দূর থেকে, আমাদের মত ।

ভাগিরথীর ব্রিজের ওপরে মন্দিরে পুজো দেবার পর
এবার যুদ্ধজয়ের আনন্দ নিয়ে প্রাক্‌গঙ্গা বিজয়ের দ্বিপ্রহর , অবাঙালী ফুড জয়েন্টে । আগুন গরম তন্দুরী রুটি, ডাল ও পনীর । সেই মূহুর্তে খিদেও চরম…..