Jan 31, 2012

মেলা ব‌ই


 শেষ ৮০র দশকে আমার যখন কলেজ বেলা তখন ব‌ইমেলা বাধ্যতামূলক ছিল । কারণ সব অনার্সের ব‌ই লাইব্রেরীতে পাওয়া যেতনা আর কিছু দুস্প্রাপ্য বিদেশী লেখকের টেক্সট ব‌ই সস্তায় পাব সেই আশায়, আর সাথে বন্ধুবান্ধবের জন্মদিনের উপহারে দিতে হবে সারাবছর ধরে , ছোট ভাইয়ের জন্য ছবির ব‌ই, মায়ের জন্য অমনিবাস । চলে আসছি, আবার মনে পড়ে গেল ঠাকুমার জন্য কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতের জন্য বাবা খোঁজ নিতে বলেছিলেন ।  আবার বেরিয়ে আসব তখন মনে পড়ল দিদিমা বলেছিলেন কার যেন লেখা শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত পুঁথি শতছিন্ন হলেও যেন নিয়ে আসি কিনে । ব‌ই কেনা, নাড়াচাড়া, সব করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খাওয়া দাওয়া সেরে ধূলো খেতে খেতে বাসে গিয়ে ওঠা ।
বিয়ের পর ব‌ইমেলা গিয়ে খোঁজ হল মাটিতে বসা তরুণ আর্টিস্টদের কাছ থেকে অরিজিনাল পেন্টিং কেনা আর কালীঘাট পটচিত্র, যামিনী রায় , নন্দলাল বসু, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামী ছবির পোষ্টার সংগ্রহ করা । ঘর সাজাতে হবে । নতুন ঘরবাঁধার জন্য  ব‌ইমেলা  । আরো কিছু টেরাকোটা শিল্পীর কাছ থেকে গিফট আইটেম কেনা  ( তখন অন্যসময় এত সব টেরাকোটা পাওয়া যেত না )  ।
৯০ শুরুতে পুত্রকে নিয়ে হাতে ব‌ই তুলে দিতে হবে । ব‌ইপড়ার অভ্যাস করাতেই হবে । কিন্তু তা তো ইংরেজী ব‌ই । বাংলা উপেন্দ্র কিশোর, সুকুমার রায়, শরদিন্দু তো আমি পড়ে বাড়িতে তাকে শোনাই । তার এক একবার এক একটা সিরিজ চাই । কোনো বার ফেমাস ফাইভ, কোনো বার সিকরেট সেভেন্, কোনো বার নডি ...তারপর এল পুরো টিনটিন, এস্ট্রিকস...  
ততদিনে বাড়ি সিলিকন-চিপময়তায় আচ্ছন্ন ।  কিন্তু ছেলে নাছোড়বান্দা । তার একহাতে চাই ব‌ই অন্যহাতে চাই গেমসিডি ।   সিডিও জায়গা করে নিল কোলকাতা ব‌ইমেলায় ।  মিলতে লাগল ফেলুদা, টেনিদা, ঘনাদার অনুবাদও ।   এ প্রজন্ম বাংলা পড়বেনা  । কিন্তু আমার ছেলের কৈশোর যে অধরা থেকে যাবে তাই অনুবাদই স‌ই ।  তখনো কোলকাতার ক্ষুধার রাজ্য সুপ্ত শিল্পীসত্তায় জেগে রয়েছে । কিন্তু ডিজিটালি । অর্কুটময় গদ্যে, ফেসবুকময় কবিতায়, ট্যুইটারময় সনেটে । যন্ত্রজালে জায়গা করে নিয়েছে কত কত উদ্বাস্তু ব্লগবসতি । দুইবাংলার পাবলিক এখন পড়ে কম, লেখে বেশী ।
এখন ব‌ইকেনার চেয়ে স্বরচিত ব‌ইপ্রকাশের পাবলিসিটিতে আত্মহারা তারা । ব‌ইমেলায় হারিয়ে যাচ্ছে শরদিন্দু, সুনীল শক্তিরা । নবপ্রজন্মের কাছে হ্যারিপটার বেশী পাত্তা পায় । ঠাকুমার ঝুলিতে ধূলোর আস্তরণ ।   আর ব‌ইয়ের পাশাপাশি অ-ব‌ইয়ের স্টলও নেহাত কম নয় ।  যে যার ঢাক পেটাচ্ছে জোরেজোরে । জিটকের চ্যাটবাক্সের হাতছানিকে  উপেক্ষা করে কে যায় আর ব‌ইমেলায় ? ব‌ইপ্রেমীর পৃথীবি ফেসবুকময় । যারা যাচ্ছে তারা খাচ্ছে কিন্তু গিলছেনা । যারা পাচ্ছে তারা হেলায় হারাচ্ছে নীহাররঞ্জন-বিভূতিভূষণদের  । আর কিছু খাচ্ছে প্রচন্ড ক্ষুধাতাড়নায় । কেউ কিনছে নতুন ব‌ইয়ের আলমারীতে অমুক সমগ্র, তমুক অমনিবাস সাজিয়ে রাখার জন্য । আর স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের গুগলময় রাজ্যে ব‌ইমেলা নেহাতই একটা মিটিং গ্রাউন্ড । শীতে প্রেমঝারি জমে ক্ষীর  ।
থরে থরে পসরা । বাঙালীর রসনা তৃপ্তির একমেবমদ্বিতীয়ম খোরাক ব‌ই । কিন্তু ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতা বেশী । ঠিক যেমন গানের সিডি বাজারে থরে থরে সাজানো কিন্তু শ্রোতার চেয়ে শিল্পী বেশি ।  
লে ছক্কা !   হাতের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র কপি-পেস্ট । বেকার পয়সা নষ্ট করা কেন !     দাদু ঠাকুমার আয়ু বেড়েছে  । দাদু আর রামায়ণ পড়েন না কারণ ডিমেনশিয়া । ঠাকুমার চৈতন্যচরিতামৃত তাকে ধূলো খায় কারণ এলঝাইমারস । বাবার নেটেই সব পড়াশুনো হয়ে যায় কারণ সামনে খোলা ল্যাপটপ  । মায়ের অনলাইন সব খবর মিলে যায় কারণ উপচে পড়া ডিজিটাল বন্ধুমহল । আর ছেলেপুলের ব‌ইমেলা যাওয়া হল নিছক আউটিং কারণ স্টেটাস সিমবল । কিন্তু তবুও সরস্বতীও আসেন এই সময়েই  । তাই ব‌ইমেলাও আসবে তার নির্ঘন্ট মেনে । থিমও থাকবে একটা কিছু । নতুন নতুন ব‌ইতে উপচে পড়বে স্টল ।  কোলকাতা ব‌ইমেলা বেঁচে থাকবে তার ঐতিহ্য আর রাজকীয়তা নিয়ে কারণ তবুও বাঙালীর একটা কিছু বলার মত নেশা হ'ল ব‌ইকেনা । 

0 comments: